
জয়নাল আবেদীন যশোরী ও জামাল হোসেন:
চীনের ইবিন-পানঝিহুয়া এক্সপ্রেসওয়েতে কিলোমিটার প্রতি খরচ যেখানে ৩৬৫ কোটি টাকা, ভারতের আট লেনের চোখধাঁধানো দ্বারকা এক্সপ্রেসওয়েতে ৩২০ কোটি আর ইন্দোনেশিয়ার মেগা শেখ মোহাম্মদ বিন জায়েদ এক্সপ্রেসওয়েতে ৩৯০ কোটি টাকা। ঠিক সেখানে বাংলাদেশের ঢাকা-আশুলিয়া এলিভেটেড এক্সপ্রেসওয়ে গড়ার নামে প্রতি কিলোমিটারে ১ হাজার ১২৭ কোটি টাকার পর্বতসম অবিশ্বাস্য অর্থ ঢেলে পৃথিবীর বুকে স্বৈরাচারী ও নির্লজ্জ লুটপাটের এক নজিরবিহীন ইতিহাস গড়ার অভিযোগ উঠেছে। আ’লীগ সরকারের বিগত আমলে দফায় দফায় কৃত্রিম ব্যয় বাড়িয়ে হাজার হাজার কোটি টাকা আত্মসাতের এই মহোৎসবে দুর্নীতি দমন কমিশন (দুদক) ও জাতীয় সংসদের কড়া নজরদারির মাঝে উঠে এসেছে মূল খলনায়ক সাভার গণপূর্ত ডিভিশনের তৎকালীন উপ-সহকারী প্রকৌশলী মো. মিজানুর রহমান, আনোয়ার খান আনু ও তার সিন্ডিকেটের নজিরবিহীন জালিয়াতির ভয়ংকর সব লুটপাটের খতিয়ান। যেখানে ঢাকা জেলা প্রশাসকের এল.এ শাখা এবং সড়ক ভবনের অসাধু প্রকৌশলীদের সাথে নিবিড় নিখুঁত যোগসাজশে প্রাথমিক নথিপত্রেই ২৩২ কোটি টাকা লুটের তথ্য বেরিয়ে এলেও ভূয়া অধিগ্রহণের নামে লুটপাট ভাগ-বাটোয়ারার এই মহাকাব্যে হাজার কোটি টাকার মাইলফলক ছাড়িয়ে যাবে বলে দুদক সূত্রে জানা যায়। অনুসন্ধানে জানা যায়, আশুলিয়া, বাইপাইল ও ইপিজেড অংশে অবকাঠামোর ক্ষতিপূরণ ও ভ্যালুয়েশন পরিমাপের দায়িত্বে থেকে গণপূর্ত উপসহকারী প্রকৌশলী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান ও আনোয়ার খান আনু কীভাবে ডিসি অফিসের এল.এ শাখার সাথে যোগসাজশ করে শত শত কোটি টাকার ভুয়া কাগজপত্র দলিল দস্তাবেজ বানিয়ে নিজেদেরর ও সহযোগীদের নামে বিল তুলে নিয়েছেন। এই অপকর্মের সুনির্দিষ্ট তথ্য মিলেছে বিশেষ করে বাইপাইল অংশের আর.এস ২১২ নম্বর দাগে। এই দাগের ৬৭ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে প্রকৃত প্রাপকদের ৩ কোটি ৪৪ লাখ টাকার বিল কাগজপত্র টেম্পারিং করে মিজান ও তার সহযোগী আশরাফুলের নামে চেক ইস্যু করিয়ে নেওয়া হয়। একইভাবে ৬৪ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে শামসুন্নাহার রেখা ও তাঁর ৭ ভাইবোনের নামে পাস হওয়া সাড়ে ৩৪ কোটি টাকার বিল কেটে প্রথমে সাড়ে ৩৪ কোটি ও পরবর্তীতে আপত্তিতে ২২ কোটি ৩২ লাখ টাকার চেক ২০২৫ সালের ১৭ জুলাই মিজান, আনোয়ার খান আনু আশরাফুল ও মোসলেহ উদ্দিন মৃধার ব্যাংক হিসাবে ছাড় করানো হয়। অথচ এই একই দাগের ৪৬ নম্বর অ্যাওয়ার্ডে আমিনুল ইসলামের দোতলা ভবন এক্সপ্রেসওয়ে থেকে ৫০ ফিট দূরে অক্ষত অবস্থায় পরিবারসহ বসবাস করা সত্ত্বেও ডিপ্লোমা প্রকৌশলী মিজান ও আনু চক্র তাঁকে ২ কোটি ১১ লাখ টাকার ভূয়া ক্ষতিপূরণ পাইয়ে দেয়।

এছাড়া সবচেয়ে বড় জালিয়াতির শিকার হন ৬৫ নম্বর অ্যাওয়ার্ডধারী নাজমুল হোসেন ভূঁইয়াসহ ১১ জন দোকান মালিক। তাােদের ১৯ কোটি টাকার বিল আটকে দিয়ে মিজান ৩৬ শতাংশ জমির মাত্র ২ শতাংশের ভূয়া ও টেম্পারিং করা দলিল ডিসি অফিসে দাখিল করে পুরো বিল আত্মসাতের পাঁয়তারা চালান। পরবর্তীতে ভুক্তভোগীরা হাইকোর্টে রিট করলে শেষ পর্যন্ত বাধ্য হয়ে সমঝোতার ফাঁদে ফেলে গত বছরের ১৫ জুলাই ব্র্যাক ব্যাংকের উত্তরা জসিমউদ্দিন শাখা থেকে দোকান মালিকদের হিসাবে জমা হওয়া টাকা থেকে ৭ কোটি ৫৯ লাখ ৯৯ হাজার ৯৯৯ টাকা সরাসরি মিজানুর ও আশরাফুলের ব্যাংক হিসাবে ট্রান্সফার করে নেওয়া হয়। আনোয়ার খান আনুও এই টাকার ভাগ পান।
এখানেই শেষ নয়, একই দাগে এওয়ার্ড ২৪/১ বাবদ ১ কোটি ২০ লাখ এবং এওয়ার্ড ৫ ও ৪৪ বাবদ আরও যথাক্রমে ২১ লাখ ও ২ কোটি ১১ লাখ টাকা মিজানের বন্ধু মোসলেহ উদ্দিন মৃধার নামে তুলে নেওয়া হয়। লুটপাটের এই ধারাবাহিকতায় আরএস ২৯৮ নম্বর দাগে আশুলিয়ার বাইতুন নুর মসজিদের অপরপাশে আব্দুর রাজ্জাকের তানভির কমক্সেক্স ও পার্শ্ববর্তী ভবন অধিগ্রহণ দেখিয়ে ২০২৩ সালের ১৮ অক্টোবর ৬৭ কোটি ২০ লাখ টাকার বিল তুলে নেওয়া হয়। সেখানে সরজমিন দেখা যায় ভবন দু’টি গার্ডার থেকে অন্তত ৩০ ফুট দূরে সম্পূর্ণ অক্ষত দাঁড়িয়ে আছে এবং কেবল বেলকনির সামান্য অংশ হাতুড়ি দিয়ে পিটিয়ে ভাঙা হয়েছে। এ বিষয়ে ভূক্তভোগী আব্দুর রাজ্জাক নিজেই স্বীকার করেন যে অধিগ্রহণের আগে স্থানীয় স্বপন ভূঁইয়া ও মোস্তফা হাজীর মাধ্যমে স্ট্যাম্পে চুক্তি করে মিজান ও আনুকে ৪০ শতাংশ কমিশন দেওয়ার শর্তে অতি সামান্য টাকা তাঁরা হাতে পান। এর পাশের আরএস ২৯৯ নম্বর দাগে শেখ মিজানুর রহমানের জমির ক্ষতিপূরণ বাবদ ৪৭ লাখ এবং বেলকনি সামান্য ছুঁয়ে যাওয়ার অজুহাতে পুরো ভবন অধিগ্রহণ দেখিয়ে প্রায় ৫০ কোটি টাকার অধিক অতিরিক্ত স্থাপনা বিল তুলে নেওয়ার পাশাপাশি নান্নু ভূঁইয়ার নামে ২৫ কোটি এবং চুন্নু ভূঁইয়ার নামে ২০ কোটি টাকার ভুয়া স্থাপনা বিল বের করা হয়, যা মূল নকশার ধারে কাছেও ছিল না।
অপরদিকে বড় আশুলিয়া মৌজার শতাধিক দাগ, জিরাবো মৌজার ২২টি, চকবাসাইদ মেজৈার ১৬টি এবং তৈয়বপুর মৌজার আরএস ৫৩৫, ৫৩৬, ৫৪৩, ৫৪৫, ৫৪৭, ৫৬২, ৮০০, ৮১১, ৮১৭, ৮১৮, ৮১৯, ৮২৪, ৮২৫, ৮২৬, ৮২৯, ৮৩১, ৮৩২ নম্বর দাগসহ বাইপাইল মৌজার ১৯১, ২১১, ২১৩, ২১৪, ৮৪৫, ৮৪৬ নম্বর দাগে মাত্র ২ থেকে ৩ ফিট অংশ গার্ডারে লাগার অজুহাতে সম্পূর্ণ ভবন অধিগ্রহণের কাল্পনিক প্রস্তাব দেখিয়ে শত শত কোটি টাকা লোপাট করা হয়েছে।
সরকারি চাকরিকে হাতিয়ার হিসাবে ব্যবহার করে ক্ষমতার সীমাহীন অপব্যবহার করে গণপূর্ত উপসহকারী প্রকৌশলী মিজানুর রহমান গড়ে তুলেছেন বিশাল বিত্তবৈভবের সাম্রাজ্য। সাভার ডিওএইচএসের ৬ নম্বর রোডের লেকভিউতে নাজমুলস ড্রিম হ্যাভেন ভবনে ৩ কোটি টাকা ব্যয়ে ইন্টেরিয়র করা ডুপ্লেক্স ফ্ল্যাট, ৬ নম্বর রোডের ১১৮-১১৯ নম্বর বাড়ি, ১২ নম্বর রোডের ২৬৯-২৭১ ও ১৭ নম্বর রোডের ৪১৩-৪১৪ নম্বর বাড়ি, ১২ নম্বর রোডের ২৬৮ নম্বর প্লট এবং ভাই কামরুজ্জামানের নামে কেনা ৪১৪ নম্বর প্লটের ফ্ল্যাটগুলো ছাড়াও ‘ডালাস ডেভেলপার্স লিমিটেড’ ও ‘ফিউচার ড্রিম বিল্ডার্স লিমিটেড’ কোম্পানির মাধ্যমে উত্তরা দিয়াবাড়ী, বসিলা ব্রিজ ও কেরানীগঞ্জের ওয়াশপুর, ঘাটারচর এলাকায় রিয়াজস্টেট ব্যবসা পরিচালনা করছেন তিনি। এছাড়া আশুলিয়ার বাইপাইল মৌজায় ৩.৩৩ শতাংশ জমি, দক্ষিণখান মৌজায় ৬.৪৭ শতাংশ জমিতে ১০ তলা বাড়ি, সাভার বড়ওয়ালিয়া মৌজায় টিনশেড বাড়িসহ ৩ শতাংশ জমি এবং মিরপুরে দুটি বিলাসবহুল ফ্ল্যাট রয়েছে তাঁর ঝুলিতে। ইউসিবি ব্যাংকের পল্লী বিদ্যুৎ শাখা, মমতাজ কনস্ট্রাকশন, ভাই কামরুজ্জামান, বন্ধু আশরাফুল ও মোসলেম উদ্দিনের নামে খোলা জয়েন্ট অ্যাকাউন্ট, ব্র্যাক ব্যাংক ও প্রাইম ব্যাংকের বিভিল্ল হিসাবে কোটি কোটি টাকার অস্বাভাবিক লেনদেনের অভিযোগ উঠেছে। উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনুর ডিওএইচএস এর উল্লেখিত ভবনগুলোতে কয়েক বিলাশবহুল এপার্টমেন্ট আছে। ধামরাই ও মানিকগঞ্জে আছে সহায়-সম্পদের বিশাল সমাহার।
ছাত্র-জনতার অভ্যুত্থানের পর এই ভয়াবহ অনিয়ম ও দুর্নীতির অভিযোগের জেরে মিজানকে সাভার থেকে প্রথমে শেরেবাংলা নগর গণপূর্ত উপ-বিভাগ-২, পরবর্তীতে সংসদ সচিবালয় এবং বর্তমানে জুলাই জাদুঘরের দায়িত্বে শেরেবাংলা নগর উপ-বিভাগ-২ এ বদলি করা হয়। তবে পুনরায় তিনি সাভার ডিভিশনে পোস্টিংয়ের জন্য কয়েক কোটি টাকা বাজেট নিয়ে আটঘাট বেঁধে মাঠে নেমেছেন বলে সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্র জানায়।
অপরদিকে ২০২৭ ব্যাচে জচাকরি পাওয়া উপসহকারী প্রকৌশলী আনোয়ার খান আনু ওই ভ্যালুয়েশন বাণিজ্যের জোড়ে বর্তমানে নামে বেনামে অর্ধশতাধিক কোটি টাকার মালিক। অনিয়ম দুর্নীতির অভিযোগে প্রথমে তাকে সাভার ডিভিশন থেকে ঢাকা গণপূর্ত বিভাগ-৩ এর উপসহকারী প্রকৌশলী (প্রাক্কলনিক) পদে বদলী করা হয়। কিন্তু অল্প কিছুদিনের মধ্যে তিনি পূর্বের স্টেশন সাভারে ফিরে যান মোটা অংকের টাকা বিনিয়োগ করে। তবে চলতি বছরে মিজান বদলীতে লটারি প্রক্রিয়া থেকে নিজেকে বাঁচাতে পারলেও পারেননি আনোয়ার খান আনু। লটারিতে তার বদলী হয় মানিকগঞ্জে। মানিকগঞ্জ বদলী হওয়ায় তেমন কোন সমস্যা হয়নি এই উপসহকারী প্রকৌশলীর। কারণ সাভারে থেকেই তিনি মানিকগঞ্জে অফিস করছেন। দেখাশুনা করছেন মিজানের সাথে যৌথ ডেভলপার ব্যবসাসহ বিভিন্ন ব্যবসা বাণিজ্য।
বিষয়গুলো নিয়ে কথা বলার জন্য মিজান ও আনুর সাথে মুঠোফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলে তাদের কাউকেই পাওয়া যায়নি। (ক্রমশ:)